আকিদার প্রকৃত পরিচয় ও গুরুত্ব






আকিদাহ কি?


আমরা সবাই 'আকিদাহ' নামের সাথে কমবেশি পরিচিত। কিন্তু ইসলামে এর অবদান কতটুকু?? তা জানার জন্য অবশ্যই এর আসল পরিচয় জানা দরকার।



আকিদার শাব্দিক বা আভিধানিক অর্থঃ

আক্বীদাহ মানে বাঁধা, বন্ধন, গিরা ইত্যাদি।

সংজ্ঞা বা পরিভাষায় আকিদাহঃ

মানুষের দৃঢ় বিশ্বাসকে আকিদাহ বলে। যেখানে কোন সন্দেহ থাকে না এবং এর ভিত্তিতেই মানুষের জীবন বিধান চলে। যেহেতু প্রতিটি মানুষ তার গভীরতম বিশ্বাসের সাথে বাঁধা, অর্থাৎ প্রতিটি মানুষ যা কিছু করে সবই তার বিশ্বাসের আলােকে করে, তাই মানুষের দৃঢ়তম বিশ্বাসকেই আক্বীদাহ্ বলে। 

মূলত আমরা আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে যা কিছু চিন্তা করি,যা কিছু বিশ্বাস করি তার সবকিছুই হচ্ছে আকিদাহ।যেমনঃআমি যদি বিশ্বাস করি যে পরিক্ষা দিলে আমি পাশ করব তাহলে এটা আমার আকিদাহ হবে। আমি যদি বলি খাবার খেলে আমি জীবিত থাকব তাহলে এটা আমার আকিদাহ।আমি  যদি বিশ্বাস করি পরিশ্রম করলে আমার জীবনের উন্নতি হবে তাহলে এটা আমার একটি আকিদাহ।

মূলত আমরা যা কিছু হবে,যা কিছু ঘটবে বা যা কিছু আমরা করলে ভালো হবে বা যা কিছু আমরা করলে খারাপ হবে এককথায় আমরা যা কিছু আছে বলে বিশ্বাস করি তার সবটুকুই হচ্ছে আকিদাহ। 

তাহলে দেখুন তো আকিদাহ কত্তো মজার একটা বিষয়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমরা যে আকিদাহ পোষন করি সেটা সঠিক না ভুল??


আকিদার প্রকারভেদঃ


আকিদাহ দুই প্রকার। যথা- 

সহীহ্ আকিদাহ 

বাতিল আকিদাহ

১)সহীহ্ আকিদাহঃ 

যে আকিদার পক্ষে  কুরআন এবং হাদীসের দালীল আছে তাকে সহীহ্ আকিদাহ বলে। যেমনঃকুরআনে সালাত আদায় করার নির্দেশ দেওয়া আছে।কাজেই কেউ যদি সালাত আদায়ের প্রতিদান পাবে এ বিশ্বাস করে সালাত আদায় করে তাহলে তার আকিদাকে আমরা বলতে পারি সহীহ আকিদাহ।একইভাবে আমরা যদি বিশ্বাস করি যে মৃত্যুর পর একটা জীবন আছে তাহলে সেই আকিদাও হবে সহীহ আকিদাহ। কেননা এ বিষয়ের দলিল কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রমাণিত। 




২)বাতিল আকিদাহঃ

যে আকিদাহ কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয় সেই আকিদাহ হচ্ছে বাতিল আকিদাহ।যেমনঃআমরা যদি বিশ্বাস করি তাবিজ আমাদের জীবন রক্ষা করবে অথবা হিফাজতে রাখবে তাহলে সেই আকিদাহ হবে বাতিল আকিদাহ। কেননা এ বিশ্বাস কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রমাণিত নয়। বরং মহানবী(সা) তাবিজকে একদম হারাম করে দিয়েছেন। তাছাড়া যদি আমরা মাজারে গিয়ে মানত করি ছেলে সন্তান লাভের জন্য তাহলে সেই আকিদাহ বাতিল আকিদাহ বলে গণ্য হবে। কেননা এ বিষয় কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত না।একইভাবে আমাদের সমাজে প্রচলিত আরও অনেক আকিদাহ বা বিশ্বাস আছে যা কোনো হাদিস বা কুরআন দ্বারা প্রমাণিত নয়।কাজেই সে সমস্ত সকল আকিদাহ বাতিল আকিদার অন্তর্ভুক্ত। 


ইসলাম ও আকিদাহঃ

এতক্ষণ আমরা জানলাম আকিদার আসল পরিচয়। কিন্তু ইসলামে আকিদাহ বলতে কি বোঝায়?

মূলত সহীহ আকিদাই হচ্ছে ইসলামি আকিদাহ।

এ সম্পর্কে শাইখ সালিহ আল ফাউযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন: “ইসলামী আক্বীদাহ হল, সেই চেতনা ও বিশ্বাসের নাম যা দিয়ে আল্লাহ তা'আলা নাবী-রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছেন। নাযিল করেছেন অনেক আসমানী কিতাব।

সহীহ আকিদাকে কেন ইসলামি আকিদাহ বলা হয়েছে?

মহান আল্লাহ তাআলা সমগ্র জগতের বাদশাহ ও সৃষ্টিকর্তা।কাজেই তিনি সমগ্র সৃষ্টিকে একটা নির্দিষ্ট নিয়মের অধীনে থাকার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।।আল্লাহ কতৃক নবি-রাসুলের উপর প্রেরিত সে সমস্ত নিয়ম কানুন,বিশ্বাস কুরআন হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। মূলত ইসলামি আকিদাহ হচ্ছে সেই বিশ্বাস  যে বিষয় বিশ্বাস করার জন্য আল্লাহ আমাদের নির্দেশ দেয়েছেন।আর মহান আল্লাহ তাআলার সে সমস্ত নির্দেশাবলি যেহেতু কুরআন ও হাদিসে উল্লেখ রয়েছে সেই জন্য কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত সেই সকল বিশ্বাসকেই ইসলামি আকিদাহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 


✔✔যেহেতু ইসলামি আকিদাই হচ্ছে সহীহ আকিদাহ কাজেই যে ব্যক্তি সহীহ আকিদাহকে অনুসরণ করবে সে সফলকাম হবে।কিন্তু যে ব্যক্তি সহীহ আকিদাহ কে ছেড়ে বাতিল আকিদাকে অনুসরণ করলো সে অবশ্যই বিপদগামী হবে।উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে,প্রচণ্ড ঝড় বাতাস!!এমতাবস্থায় কোনো ব্যক্তি  একটা শক্ত গাছকে আঁকড়ে ধরে রাখলো।ঝড় বাতাসে ঘরবাড়ি সবকিছু উড়ে গেল কিন্তু অবশেষে সেই শক্ত গাছকে ধরে রাখার জন্য সে বেঁচে গেল।তাহলে সেই ঝড় বাতাসকে আমরা বলতে পারি বাতিল আকিদাহ যা আমাদের সমাজে বলতে গেলে ঝড় আকারেই আছে।আর ঐ শক্ত গাছকে বলতে পারি সহীহ আকিদাহ যা আঁকড়ে ধরে রাখার জন্য মানুষটা বেঁচে গেল। ✔✔


আকিদাহ সম্পর্কিত কুরআনের কিছু আয়াতঃ

মহান আল্লাহ সমগ্র মানুষ ও জ্বীন জাতির উপর সেই বিশ্বাস পােষণ করা অপরিহার্য করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেনঃ

وَمَا خَلَقۡتُ الۡجِنَّ وَالۡاِنۡسَ اِلَّا لِيَعۡبُدُوۡنِ  , مَاۤ اُرِيۡدُ مِنۡهُمۡ مِّنۡ رِّزۡقٍ وَّمَاۤ اُرِيۡدُ اَنۡ يُّطۡعِمُوۡنِ‏

“এবং আমি জ্বীন ও মানুষ জাতিকে শুধুমাত্র আমার ইবাদাতের জন্য সৃষ্টি করেছি। আমি তাদের নিকট কোন জীবিকা চাইনা এবং চাইনা যে তারা আমাকে খাদ্য দান করুক।”- (সূরা যারিয়াতঃ ৫৬-৫৭)

তিনি আরও বলেনঃ 

وَقَضٰى رَبُّكَ اَلَّا تَعۡبُدُوۡۤا اِلَّاۤ اِيَّاهُ

“এবং তােমার প্রতিপালক চূড়ান্ত ফায়সালা দিয়েছেন যে, তােমরা তাঁর ছাড়া আর কারও ইবাদাত করবে না।” - (সূরা ইসরাঃ ২৩)

তিনি আরও বলেনঃ

وَلَـقَدۡ بَعَثۡنَا فِىۡ كُلِّ اُمَّةٍ رَّسُوۡلًا اَنِ اعۡبُدُوا اللّٰهَ وَاجۡتَنِبُوا الطَّاغُوۡتَ​ۚ

“এবং আমি প্রত্যেক জাতির নিকট এ মর্মে রাসূল পাঠিয়েছে যে,তােমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং ত্বাগুত (তথা আল্লাহ ছাড়া যে সকল জিনিসের ইবাদাত করা হয়) সেগুলাে থেকে দূরে থাক।”- (সূরা আন নাহলঃ ৩৬)


উল্লেখিত আয়াতসমূহ থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, সমস্ত নাবী-রাসূল এ আক্বীদার আহ্বান নিয়ে পৃথিবীতে আগমণ করেছিলেন। সমস্ত আসমানী কিতাব অবতীর্ণ হয়েছিল এ আক্বীদারই ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার জন্য এবং এর বিপরীত সকল বাত্বিল বিশ্বাস ও ভ্রান্ত ধারণাকে অপনােদন করার জন্য। সৃষ্টি জগতের মধ্যে যাদের উপর শরীয়তের বিধান প্রযােজ্য হয় তাদের প্রত্যেককে এই আক্বীদাহ গ্রহণ করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।


সহীহ্ আকিদার গুরুত্বঃ

আকিদার এত বেশি গুরুত্ব ও মর্যাদা সেটি সব কিছুর আগে সর্বাধিক গুরুত্বের সাথে আলােচনা, পর্যালােচনা ও গবেষণা হওয়া প্রয়ােজন। সবচেয়ে বেশি দরকার এ ব্যাপারে জ্ঞানার্জন করা। কারণ, এর উপরই মানব জাতির দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্য ও সাফল্য নির্ভর করছে। আকিদার জ্ঞান ছাড়া কোনো ব্যক্তি প্রকৃত মুসলিম হতে পারে না । 

এ সম্পর্কিত কুরআনের কিছু আয়াতঃ


আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা বলেনঃ

فَمَنۡ يَّكۡفُرۡ بِالطَّاغُوۡتِ وَيُؤۡمِنۡۢ بِاللّٰهِ فَقَدِ اسۡتَمۡسَكَ بِالۡعُرۡوَةِ الۡوُثۡقٰى لَا انْفِصَامَ لَهَا

“সুতরাং যে ত্বাগুতকে অস্বীকার করে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করল সে যেন শক্ত হাতল মজবুতভাবে ধারণ করল যা বিচ্ছিন্ন হওয়ার নয়।” - (সূরা বাকারাঃ ২৫৬)

এ কথার মানে হল, যে এ আক্বীদাহ হতে হাত গুটিয়ে নিবে সে অলীক-কল্পনা ও ভ্রান্ত বিশ্বাসকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে। কারণ, সঠিক পথ ছেড়ে দিলে সেখানে গােমরাহী ছাড়া অন্যকিছু থাকতে পারেনা। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

ذٰ لِكَ بِاَنَّ اللّٰهَ هُوَ الۡحَـقُّ وَاَنَّ مَا يَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِهٖ هُوَ الۡبَاطِلُ

“তা এ জন্যে যে, আল্লাহই তাে প্রকৃত সত্য আর তাঁকে ছাড়া ওরা যা কিছু আহবান করে তা ভ্রান্ত।”- (সূরা হজ্জঃ ৬২)

[উৎস: ইরশাদ ইলা সহীহ্িল ইতিকাদ, লেখক: শাইখ আল্লাম সালিহ আল ফাউযান]



ঈমান-আকিদাহ শুদ্ধ না হলে ছালাত-ছিয়াম সহ কোন ইবাদই আল্লাহর নিকট গ্রহনীয় হবে না। যেমন কেউ যদি শির্কী আকিদাহ পোষণ করে তাহলে যত ইবাদাতই করুক না কেন সব কিছুই বিফলে যাবে।এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ


“আমি তাদের কৃতকর্মের নিকট আগমন করে সেগুলােকে উৎক্ষিপ্ত ধুলিকণায় পরিণত করব।”- (সূরা ফুরকানঃ ২৩)


ইসলামি আকিদাহ সম্পর্কে  জ্ঞানার্জন করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য আবশ্যক। আকিদাহ বলতে কী বুঝায়, আকিদার উপর আর কী কী জিনিস নির্ভর করে, বিপরীত আকিদাগুলো কী কী, কী কারণে আকিদাহ নষ্ট হয় বা তাতে কমতি সৃষ্টি হয় যেমন বড় শির্ক, ছােট শির্ক ইত্যাদি বিষয়ে প্রতিটি মুসলিমের জানা বা শিক্ষা অর্জন করা অপরিহার্য। আল্লাহ বলেনঃ

فَاعۡلَمۡ اَنَّهٗ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللّٰهُ وَاسۡتَغۡفِرۡ لِذَنۡۢبِكَ

“অতএব, জেনে রাখ যে আল্লাহ ছাড়া ইবাদাতের উপযুক্ত আর কেউ নাই। এবং তােমার গুনাহর জন্য তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর।”- সুরা মুহাম্মাদঃ ১৯



উপরােক্ত আলােচনা থেকে প্রতিভাত হল যে, ঈমান ও আকিদাহ সঠিক না হওয়া পর্যন্ত অন্যান্য নেক 'আমালের কোনই মুল্য নাই। তাই 'আমাল সংশােধনের পূর্বে আকিদাহ সংশােধন করা এবং সে বিষয়ে জ্ঞানার্জন করা আবশ্যক। আল্লাহু আলাম।

আকিদার মূল ভিত্তি

আকিদার মূল ভিত্তি ৬টি

❀ আল্লাহকে বিশ্বাস করা,

❀ আল্লাহর ফেরেশতা বিশ্বাস করা,

❀ তাঁর কিতাব বিশ্বাস করা,

❀ নাবী-রাসূল বিশ্বাস করা,

❀ আখিরাত বিশ্বাস করা,

❀ ভাগ্যের ভালাে মন্দ বিশ্বাস করা, 

এগুলােকে ঈমানের রুকন বলা হয়।

আকিদার উৎস

আক্বীদার উৎস হলাে কুরআন ও সহীহ্ হাদীছ। কুরআন ও সহীহ্ হাদীছে নেই এমন কোন আক্বীদাহ গ্রহণ করা মুসলিমের জন্য জায়েয নেই।

ইসলামি  আকিদাহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের উপকারিতা ঃ

আল্লাহ যে উদ্দেশ্যে আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তা বুঝা এবং বাস্তবায়ন করা সহজ হবে। ফলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন এবং জান্নাত দান করবেন, তাওহীদের উপর টিকে থাকা সহজ হবে এবং শির্ক থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব হবে।

Post a Comment

0 Comments